শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

উস্কানি কাম্য নয়

আমাদের দেশে ছাত্র-জনতার যুগপৎ আন্দোলনে শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী অপশাসন-দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের অবৈধ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবেই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দিয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় ধ্বংস করা হয়েছিল দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে পরিণত করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ও দলদাস প্রতিষ্ঠানে। দেশকে মেধা ও নেতৃত্বশূন্য করার জন্যই কথিত বিচারের নামে জাতীয় নেতাদের একের পর এক হত্যা করে দেশকে রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত করা হয়েছিল। জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারবিভাগ সহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করার কারণে দেশ অপরাধ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ নিজেদের অবৈধ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতেই দেশকে রীতিমত পুলিশী রাষ্ট্্ের পরিণত করে। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ না থাকায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের স্বীকৃত বিরোধী দলগুলো বর্জন করে। কিন্তু সে একতরফা নির্বাচনেও জনগণ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। শুধুমাত্র ঢাকা সিটিতে ২৯টি ভোট কেন্দ্রে কোন ভোট প্রদান না করলেও সেসব ভোট কেন্দ্রে ৪০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়। আর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা তো কারোরই অজানা নয়। তথাকথিত সে নির্বাচনের প্রশাসনের সহায়তায় রাতেই বেলায় ব্যালট ভর্তি করা হয়। এরপর আসে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন। যে নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ গ্রহণ না করলেও একতরফা নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির মহোৎসব চলছে। আর বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোন মহলের কাছেই দ্বিমত নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারের জুলুম-নির্যাতন, অপশাসন-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোতে বরাবরই আন্দোলন করে এসেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকার জনগণের সেসব আন্দোলন দলীয় সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সফল হয়েছে আমাদের দেশের কমলামতি শিক্ষার্থীরা। তাদের নির্মোহ আত্মত্যাগ ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের কারণেই স্বৈরাচারি শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছেন। বিষয়টি আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ হলেও বিদেশী কোন কোন মহলের তা মোটেই পছন্দ হয়নি। ফলে তারা আমাদের দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বায়বীয় অভিযোগ তুলে ছাত্র-জনতার এই বিজয়কে বিতর্কিত করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। যা শুধু অনভিপ্রেতই নয় বরং অনাকাক্সিক্ষতও।

সে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে ইন্দিরা গান্ধী যেভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সেভাবেই নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রিজওয়ান আরশাদ নামে ভারতের এক কংগ্রেস বিধায়ক। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়ে এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নৃশংস হামলার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এ আহ্বান জানান। সম্প্রতি ইকোনমিক টাইমস-সহ ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

কংগ্রেস বিধায়ক রিজওয়ান আরশাদ কর্ণাটক রাজ্যের শিবাজিনগরের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সম্প্রতি মোদিকে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেখানে হিন্দুদের ওপর নৃশংসতার কথা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং ভিডিও দেখে গভীরভাবে ব্যথিত ভারতের একজন উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে আমি আজ আপনাকে লিখছি।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে ওই প্রতিবেদনগুলো সত্য হলে তা মোকাবিলায় একটি ‘সক্রিয় অবস্থান’ গ্রহণ করা অপরিহার্য বলেও চিঠিতে মত দেন আরশাদ। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য অবিলম্বে নতুন অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গেও জড়িত হতে মোদিকে পরামর্শ দেন তিনি।

ভারতের জনগণ সব সময় ন্যায়বিচার, শান্তি এবং মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ায় দাবি করে মোদির উদ্দেশে আরশাদ লিখেছেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭১ সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর মতো সামরিক পদক্ষেপ নিতে আপনার দ্বিধা করা উচিত নয়। আমি আপনাকে এ সংকটময় সময়ে বাংলাদেশে আমাদের হিন্দু ভাই ও বোনদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আপনার সম্মানিত অফিস ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করছি।’

কংগ্রেস বিধায়ক আরও লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আপনার (মোদি) নেতৃত্বে ভারত শুধু বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উদ্বেগই নয়, ভারতেও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেবে। যারা দক্ষিণপন্থিদের দ্বারা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হয়েছে।’

একথা কোনভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক বিশে^র এক রোল মডেল। আমাদের দেশে কোন সাম্প্রদায়িকতা নেই। আমরা সংখ্যালঘু কনসেপ্টেও বিশ^াস করি না। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আমরা সকলেই বাংলাদেশী। কিন্তু বিদেশ থেকে একটি মহল আমাদের দেশে হিন্দু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয়ের ওপর হামলার কল্পকাহিনীর প্রচার করছে। তার যপোথযুক্ত জবাব দিয়ে আমাদের পরিবেশ উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আমাদের দেশে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মত কোন ঘটনা ঘটেনি’। কিন্তু কংগ্রেস বিধায়ক বাংলাদেশে যে সামরিক অভিযান চালানোর কথা বলেছেন তা রীতিমত উস্কানিমূলক। তার মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আর দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখ-তা রক্ষায় আমাদের ছাত্র-জনতা সবসময়ই ঐক্যবদ্ধ। তাই সংশ্লিষ্টরেদ স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই সতর্ক মন্তব্য করা উচিত। এক্ষেত্রে উস্কানি কোনভাবেই কাম্য নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ